সারাদেশ

অবহেলায় ডুবে যাচ্ছে শৈশব: নোয়াখালীতে ৯ উপজেলায় ১৯৩ শিশু পানিতে, মৃত্যু ৭২

অবহেলায় ডুবে যাচ্ছে শৈশব: নোয়াখালীতে ৯ উপজেলায় ১৯৩ শিশু পানিতে, মৃত্যু ৭২
📷 ছবি: সংগৃহীত
অবহেলায় ডুবে যাচ্ছে শৈশব: নোয়াখালীতে ৯ উপজেলায় ১৯৩ শিশু পানিতে, মৃত্যু ৭২

মোহাম্মদ উল্যা

বিশেষ প্রতিনিধি:
কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

নোয়াখালীতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে নয়টি উপজেলায় ১৯৩ শিশু পানিতে পড়ে গেছে। এর মধ্যে ৭২ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে পড়ার ঘটনা ঘটেছে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়। সেখানে এ সময়ে ৫৬ শিশু পানিতে পড়ে, যার মধ্যে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এর পরেই রয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এ উপজেলায় ৩৮ শিশু পানিতে পড়ে যায়। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ শিশু। পরিসংখ্যানটি শুধু একটি সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অপূরণীয় শোকের গল্প।

শিশু পানিতে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাকে অনেক সময় দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলেও এর পেছনে পারিবারিক অসচেতনতা ও যথাযথ নজরদারির অভাব বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বাড়ির আশপাশে পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা জলাশয় থাকা সত্ত্বেও শিশুদের নিরাপদে রাখার বিষয়ে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সতর্কতা না থাকা এসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমান সময়ে শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে দীর্ঘ সময় মোবাইল হাতে তুলে দেওয়ার প্রবণতার পাশাপাশি অনেক পরিবারে শিশুর চলাফেরার ওপর প্রয়োজনীয় নজরদারিও থাকে না। অভিভাবক এক মুহূর্তের জন্য অসতর্ক হলেই ঘটে যেতে পারে এমন একটি দুর্ঘটনা, যার ক্ষত সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ের ঝুঁকি চিহ্নিত করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, শিশুদের একা পানির কাছে যেতে না দেওয়া, বাড়ির প্রবেশপথ ও জলাশয়ের আশপাশে নিরাপদ বেড়া দেওয়া এবং শিশুদের সাঁতার ও পানিতে নিরাপদ থাকার মৌলিক কৌশল শেখানো জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ষা মৌসুমে জলাশয়ে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই এ সময়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা নয়, দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে—সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেই দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

একটি শিশুর মৃত্যু কোনো পরিবারের একার ক্ষতি নয়; এটি সমাজেরও অপূরণীয় ক্ষতি। সন্তান পানিতে পড়ে যাওয়ার পর আহাজারি, অনুশোচনা কিংবা দায় চাপিয়ে কোনোভাবেই তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই প্রিয় সন্তানকে হারানোর আগে সতর্ক হওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

পরিসংখ্যানের এই নির্মম চিত্র আমাদের জন্য সতর্কবার্তা—সন্তান হারিয়ে কাঁদার আগে সন্তানকে নিরাপদ রাখুন। এক মুহূর্তের অবহেলা যেন একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ না হয়।