গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
শহরের ব্যস্ত সড়ক। পথচারী আর যানবাহনের ছুটে চলা। এরই মাঝে হাতে রঙের কৌটা ও তুলি নিয়ে ব্যস্ত এক মানুষ। কোথাও মুছে যাওয়া ট্রাফিক চিহ্ন, কোথাও নষ্ট হয়ে যাওয়া মাইলফলক, আবার কোথাও রাস্তার পাশে জমে থাকা ঝোপঝাড়—চোখে পড়লেই থেমে যান তিনি। নিজের অর্থ খরচ করেন, নিজের শ্রম দেন। বিনিময়ে চান না কোনো স্বীকৃতি।
তিনি রেজওয়ান আনাম। গাইবান্ধার মানুষের কাছে যিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘মানবিক ফেরিওয়ালা’ নামে।
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কিংবা অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনো কিছু তার চোখ এড়িয়ে যায় না। যে কাজটি হয়তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার অপেক্ষায় পড়ে থাকতে পারে দিনের পর দিন, সেটিই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ হাতে ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা করেন রেজওয়ান।
সম্প্রতি গাইবান্ধা ১ নম্বর রেলগেটের ট্রাফিক মোড়ে মুছে যাওয়া পথচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক চিহ্নগুলো নিজের উদ্যোগে আবারও এঁকে দিয়েছেন তিনি। রঙের আঁচড়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন সড়কের হারিয়ে যাওয়া নির্দেশনা।
তার এমন উদ্যোগে পথচারীদের যেমন উপকার হচ্ছে, তেমনি সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মানুষের উপকারেই আনন্দ
রেজওয়ান আনামের কাজ শুধু রাস্তা কিংবা ট্রাফিক চিহ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের গরিব, মেহনতি ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও তার নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডের অংশ। পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ।
কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় নয়, বরং মানুষের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ থেকেই তিনি এসব কাজ করে চলেছেন। তার কাছে মানবিকতা কোনো বড় আয়োজনের বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
চোখে পড়ে সমস্যা, হাত বাড়িয়ে দেন সমাধানে
রাস্তার মাইলফলক ভেঙে গেছে—তিনি মেরামতের চেষ্টা করেন। রং উঠে গেছে—তুলি হাতে নেন। ঝোপঝাড়ে পথ ঢেকে যাচ্ছে—নিজেই পরিষ্কারে নেমে পড়েন। সড়কের কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন মুছে গেছে—সেটিও পুনরায় আঁকার উদ্যোগ নেন।
এভাবেই নীরবে নিজের চারপাশকে একটু সুন্দর, নিরাপদ ও মানুষের চলাচলের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করছেন রেজওয়ান।
তার এই কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এসবের জন্য তিনি অপেক্ষা করেন না কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব, নির্দেশনা কিংবা বরাদ্দের। নিজের সাধ্যের মধ্যেই যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই করেন।
নীরব এই উদ্যোগের বড় বার্তা
সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় আয়োজন কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি মুছে যাওয়া ট্রাফিক চিহ্ন আবার এঁকে দেওয়া, একটি মাইলফলক রং করে দেওয়া কিংবা রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করাও হতে পারে জনকল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
রেজওয়ান আনামের কর্মকাণ্ড যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়।
গাইবান্ধার ব্যস্ত সড়কে হয়তো প্রতিদিনই তাকে দেখা যাবে হাতে রঙের কৌটা কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে। কেউ তাকে দেখবেন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, কেউ দেখবেন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। কিন্তু তার কাজের মধ্য দিয়ে তিনি যে পরিচয়টি তৈরি করেছেন, সেটি আরও বড়—মানুষের জন্য কাজ করা একজন মানবিক মানুষ।
নিজের খরচে, নিজের শ্রমে মানুষের চলার পথটুকু একটু সহজ করে দেওয়ার এই নীরব প্রচেষ্টাই তাকে গাইবান্ধার মানুষের কাছে আলাদা করে তুলেছে। আর তাই ভালোবেসেই অনেকে তাকে ডাকেন—‘গাইবান্ধার মানবিক ফেরিওয়ালা’।
নিজ খরচে পথের যত্ন, গাইবান্ধার ‘মানবিক ফেরিওয়ালা’ রেজওয়ান
📷 ছবি: সংগৃহীত