বাংলাদেশ

প্রশ্নে ভুল, বিতরণেও গরমিল; এখন পরিবর্তন আসছে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে

প্রশ্নে ভুল, বিতরণেও গরমিল; এখন পরিবর্তন আসছে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে
📷 ছবি: সংগৃহীত
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছে। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।

শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন বা পরিশোধনেই (মডারেশন) ভুল নয়, এবার প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটেছে গরমিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা।

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষার ফলাফলের ওপরই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ও কর্মজীবনের অনেক কিছু নির্ভর করে। ফলে প্রশ্নপত্রের সামান্য ভুলও একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। আর প্রশ্নপত্র বিতরণে ভুল হলে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়, যা তার পরীক্ষা দেওয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশ্নপত্রে ভুল, অসংগতির অভিযোগ এবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়। কোনো কোনো বিষয়ের প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হওয়ার অভিযোগের মধ্যেই কিছু বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাতীয় সংসদেই বলেছেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। ভুল হওয়া পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের ইংরেজি ভার্সনের নৈর্ব্যক্তিক অংশের তিনটি প্রশ্নে অসংগতি থাকার অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ওই তিনটি প্রশ্নে বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। রসায়নেও ইংরেজি সংস্করণের প্রশ্নে অসংগতির অভিযোগ ওঠে।

ঢাকার উত্তরার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইংরেজি ভার্সনের এক পরীক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চতর গণিতের একটি প্রশ্নের বিষয় তাঁর জানা ছিল। কিন্তু প্রশ্নটিতে অসংগতি থাকায় তিনি সেটির উত্তর দেননি। পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় ঝুঁকি না নিয়ে কম আয়ত্তে থাকা আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, জানা প্রশ্নটিতে অসংগতি না থাকলে তাঁকে এ সমস্যায় পড়তে হতো না।

ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতির ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় এমন অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু প্রথম আলোকে বলেন, ভুলের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়, যাতে পরীক্ষার্থীরা নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধায় না পড়েন।

তাঁর দাবি, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে বড় ধরনের কোনো ভুল ছিল না। তবে বানান ভুল বা এ ধরনের কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।

পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও বিভিন্ন কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো বিষয়ের প্রশ্ন তুলনামূলক ‘কঠিন’ হওয়ার কারণেও শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন।

প্রশ্নপত্র বিতরণেও ভুল
এবার বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২৭ জুলাই দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় এইচএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্রে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি কক্ষ পরিদর্শককে জানালে ভুল প্রশ্নপত্র তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পাশের কেন্দ্র থেকে প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র এনে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

আগামী পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার মডারেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র পরিশোধনের সময় ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষকের পাশাপাশি একজন ইংরেজি ভাষার শিক্ষক রাখা হবে। এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ থেকে তা শুরু করা হচ্ছে।
—জেসমিন তাসলিমা বানু, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড
এর আগে ১৫ জুলাই বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি মোজাফ্ফর হোসেন কলেজ (এম এইচ কলেজ) কেন্দ্রে গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্রে এ বছরের নিয়মিত ৪২ জন পরীক্ষার্থীর যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ভুল স্বীকার করে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে লিখিত প্রতিবেদন পাঠায়। এ ঘটনায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড কলেজ পরিদর্শক মাহবুব আলমকে প্রধান করে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

জামালপুরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। ৪ জুলাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্নপত্রে শতাধিক নিয়মিত শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই কেন্দ্রের একটি কক্ষে ভুলবশত নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার পর বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বোর্ড থেকে ১০০ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে পাঠাতে বলা হয়। তাঁদের উত্তরপত্র ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্র অনুযায়ী বিবেচনা করার কথা জানানো হয়।

এ ঘটনায় জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ মীর শওকত আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে কলেজের পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হয়।

চলতি মাসে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরেও ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে ১৪ পরীক্ষার্থীকে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ২ আগস্ট এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন খানসহ তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে প্রশাসন।