বিনোদন

মঞ্চের ‘গুরু’ জেমসের আড়ালের জীবন, যা জানেন না অনেকেই

মঞ্চের ‘গুরু’  জেমসের আড়ালের জীবন, যা জানেন না অনেকেই
📷 ছবি: সংগৃহীত
মঞ্চের ‘গুরু’ জেমসের আড়ালের জীবন, যা জানেন না অনেকেই


মঞ্চে উঠলেই তিনি ‘গুরু’। হাতে গিটার তুলে নিলে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান হাজারো শ্রোতা। ‘সিনায় সিনায় লাগে টান’ কিংবা ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’, এমন অসংখ্য গানের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে একাধিক প্রজন্ম। কিন্তু মঞ্চের আলো নিভে গেলে জেমস যেন চলে যান অন্য এক জগতে। ব্যক্তিজীবন নিয়ে বরাবরই আড়ালে থাকা এই শিল্পী কীভাবে সময় কাটান, তাঁর পছন্দ-অপছন্দই বা কী, এসব নিয়ে ভক্তদের কৌতূহলের শেষ নেই।

আজ জেমসের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্ম নেওয়া ফারুক মাহফুজ আনামের জীবনের নানা অজানা অধ্যায় ফিরে দেখার দিনও এটি।

নদীতে সাঁতার কাটা সেই দুরন্ত ছেলেটি

শৈশব থেকেই বেশ দুরন্ত ছিলেন জেমস। নিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি ছিলাম এক্সট্রোভার্ট (বহির্মুখী), ভীষণ দুরন্তপনা করেছি ছেলেবেলায়।’

সেই দুরন্ত সময়ের অন্যতম সঙ্গী ছিল নদী। নওগাঁয় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটতেন তিনি। কখনো কখনো সাঁতরে চলে যেতেন নদীর মাঝামাঝি পর্যন্ত। এখন আর সেইভাবে নদীতে সাঁতার কাটার সুযোগ হয় না। তবে নদীর প্রতি সেই টান তাঁর গানে রয়ে গেছে। ‘তুমি যদি নদী হও, আমি হব জেগে থাকা চর’—এর মতো গানে যার ছাপ পাওয়া যায়।

এক শহর থেকে আরেক শহরে বেড়ে ওঠা জেমসের বাবা মোজাম্মেল হক ছিলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। বাবার সরকারি চাকরির কারণে শৈশব ও কৈশোরে দেশের বিভিন্ন শহরে থাকতে হয়েছে তাঁকে।

সিলেটের ব্লু-বার্ড স্কুলে তাঁর পড়াশোনার শুরু। পরে পড়েছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে। কলেজজীবনের একটি সময় কেটেছে নীলফামারী ও সিরাজগঞ্জে।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গানের প্রতি তাঁর আগ্রহও গভীর হতে থাকে। একপর্যায়ে সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান আকর্ষণ। পরিবারের কেউ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় মা-বাবা বড় ছেলে জেমসকে পেশা হিসেবে গান বেছে নিতে দিতে চাননি।

পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে একসময় ঘর ছাড়েন তিনি। এরপর চট্টগ্রামের কদমতলীর পাঠানটুলি রোডের আজিজ বোর্ডিং হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের ঠিকানা।

আজিজ বোর্ডিংয়ের ৩৬ নম্বর ঘর আজিজ বোর্ডিংয়ের ৩৬ নম্বর কক্ষেই কেটেছে জেমসের জীবনের স্মরণীয় কিছু দিন। ছোট্ট সেই ঘরে ছিল আড্ডা, গান, স্বপ্ন আর প্রিয় গিটার।

জেমস নিজেই সেই সময়ের স্মৃতি মনে করে বলেছেন, ‘আড্ডা আর গান যা-ই হোক না কেন, সব ওখানেই। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো কখনো ভুলব না।’

পরে সেই স্মৃতিই জায়গা করে নেয় তাঁর ‘আজিজ বোর্ডিং’ গানে। একটি ছোট ঘর, ছোট খাট, টেবিল, পানির জগ আর গিটার, এই সামান্য জিনিসগুলোই ছিল তখন তাঁর পৃথিবী।

তারকা হওয়ার পর আর সেই ঘরে যাওয়া হয়নি। তবে কক্ষটির বর্তমান বাসিন্দারা এখনো জেমসের জন্মদিনে কেক কাটেন। সুযোগ পেলে সেখানে আবার যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষদের হারিয়েছেন জেমসের সংগীতজীবনের উত্থানের সময়ই জীবনের কাছের দুই মানুষ, মা ও বাবা, চলে যান। মা জাহানারা খাতুনের স্মৃতিও তাঁর গানে উঠে এসেছে।

মাকে স্মরণ করে লেখা ‘সবাই বলে ওই আকাশে লুকিয়ে আছে, খুঁজে দেখো, পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে’ গানটি শ্রোতাদের কাছে আজও পরিচিত।

ছোট ভাই রুশো বর্তমানে নওগাঁয় পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন।

নিজের সংসার নিয়েও বরাবরই ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রেখেছেন জেমস। তিনি চার সন্তানের বাবা, বড় ছেলে দানিশ, এরপর দুই মেয়ে জান্নাত ও জাহান এবং জিবরান আনাম।

ব্যক্তিজীবন আড়ালে রাখার কারণও জেমস নিজেই জানিয়েছেন, ‘আমার গানের জীবনের বাইরে ব্যক্তিজীবনটা প্রকাশিত হোক, সেটা কখনো চাইনি।’

মঞ্চের বাইরে ক্যামেরা হাতে জেমস

গানের ব্যস্ততার বাইরে জেমসের অবসরজীবন অনেকটাই সাধারণ। টেলিভিশন দেখা ও বই পড়ার পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিদেশে স্টেজ শো করতে গেলে অবসর সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে শখটি পরিণত হয়েছে নেশায়। বিশেষ করে ল্যান্ডস্কেপ ছবি তুলতে বেশি পছন্দ করেন।

কক্সবাজারের বিভিন্ন দৃশ্যও ক্যামেরায় ধারণ করেছেন তিনি। কখনো মডেলদের ছবিও তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ফটোগ্রাফারমাত্রই জানে, এটা অদ্ভুত একটা নেশা। একবার ফটোগ্রাফির পোকা ঢুকলে মাথা থেকে বের করা মুশকিল।’

বাংলাদেশে ছবি তোলার সময় অবশ্য ভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে। তাঁকে দেখলেই ভক্তরা ঘিরে ধরেন। অথচ ভালো ছবি তুলতে আলোকচিত্রীকে থাকতে হয় অনেকটাই আড়ালে।

এ কারণে পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারের ছবি তোলার ইচ্ছা থাকলেও সেটি কীভাবে সম্ভব হবে, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। ভবিষ্যতে নিজের তোলা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

সম্প্রতি ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া সফরেও ক্যামেরা ছিল তাঁর সঙ্গী। স্টেজ শোর ফাঁকে ঘুরেছেন, ছবি তুলেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন।

পুরোনো বন্ধুত্ব এখনো অটুট

জেমসের বন্ধুত্বের পরিসরও দীর্ঘদিনের। স্কুল-কলেজের বন্ধুদের পাশাপাশি সংগীতজগতের সহযোদ্ধারাও রয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠদের তালিকায়।

স্কুলের বন্ধু ইমতিয়াজ এখন কানাডার টরন্টোতে থাকেন। মিমি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। নীলফামারী কলেজের বন্ধু ওয়াজেদ পেশায় চিকিৎসক এবং অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন।



ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত যোগাযোগ না হলেও দুই-তিন বছর পরপর অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তাঁর।

সংগীতজগতের বন্ধুত্বের গল্পও পুরোনো। আইয়ুব বাচ্চু, হামিন আহমেদ, মাকসুদ ও পার্থ বড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শুরু সেই শুরুর দিনগুলো থেকেই। একই সময়ে পথচলা, প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া এবং নানা পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তাঁদের বন্ধুত্ব।

এখনো ব্যান্ড মিউজিকের বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে বামবা নিয়ে আলোচনা হলে তাঁরা একসঙ্গে বসেন, আড্ডা দেন।

বই ও সিনেমাতেও আগ্রহ

গানের বাইরে সিনেমা দেখতেও পছন্দ করেন জেমস। বিশেষ করে ক্ল্যাসিক সিনেমার প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে।

সাহিত্যে তাঁর পছন্দের লেখকদের মধ্যে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও নাগিব মাহফুজ।

খাবারের পছন্দেও রয়েছে দেশি স্বাদ। ভাত, ডাল, গরুর মাংস, আইড় মাছ, পাবদাসহ নানা ধরনের মাছ তাঁর পছন্দ। দেশের বাইরে কোরিয়ান ও জাপানি খাবারও খান।

তবে রান্নাঘরে তাঁর উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না। রান্না করতে পারেন না বললেই চলে।

ফিটনেস নিয়েও সচেতন জেমস। নিয়মিত জিমে যান এবং সাধারণ ব্যায়াম করেন। ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট পছন্দ। বাংলাদেশের পর তাঁর প্রিয় শহরের তালিকায় রয়েছে কলকাতা, নিউইয়র্ক ও জুরিখ।

নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়, আনন্দের পথেই চলা

দীর্ঘ সংগীতজীবনেও নিজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করেননি জেমস। তাঁর কাছে ভালো লাগার কাজ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটা দিনই আমি আমার মতো করে উপভোগ করি।’ তাঁর ভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে সামনে এগোনোর বদলে যে কাজ করে আনন্দ পান, সেটিই করেন। আগ্রহ না থাকলে কোনো কাজই করেন না।

সংগীতের ক্ষেত্রেও একই দর্শন তাঁর। গান করতে এসে বড় কোনো লক্ষ্য স্থির করেননি। গান করাই তাঁর কাছে আনন্দ ও প্যাশনের বিষয়।

দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়তা, অসংখ্য শ্রোতার ভালোবাসা এবং ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিতি, সবকিছুর পরও তাঁর নিজের হিসাবটা সহজ, ‘কিছু না হলেও গানই করতাম।’

মানুষের ভিড় পেরিয়ে নির্জনতায় মঞ্চে হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইলেও ব্যক্তিজীবনে জেমস একা থাকতে পছন্দ করেন। নির্জনতায় নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ পান, কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া যায়, এ কারণেই একাকিত্ব তাঁর কাছে স্বস্তির।

বাড়তি আড্ডারও খুব একটা প্রয়োজন বোধ করেন না তিনি। তবে গানের প্রয়োজনে দেশ কিংবা বিদেশ, যেখানেই যেতে হোক, প্রস্তুত থাকেন।

ভবিষ্যতে শহরের কোলাহল থেকে আরও দূরে থাকার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর। ঢাকার বাইরে গাড়িতে দুই-তিন ঘণ্টার দূরত্বে কোনো নিরিবিলি জায়গায় বসত গড়ার কথা ভাবেন। কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় আসবেন, কাজ শেষ হলে আবার ফিরে যাবেন সেই নির্জনতায়।



১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্ম নেওয়া ফারুক মাহফুজ আনাম আজ বাংলাদেশের সংগীতের অন্যতম পরিচিত নাম। কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য গান দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। মঞ্চে তাঁকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। কিন্তু সেই মঞ্চের বাইরের জগৎ তিনি বরাবরই নিজের মধ্যে রেখেছেন।

হয়তো এ কারণেই ‘গুরু’ জেমসকে সবাই চেনেন, কিন্তু ফারুক মাহফুজ আনামের অজানা জীবনকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল এখনো শেষ হয়নি।