সারাদেশ

সামাজিক মাধ্যম ও মাঠে সয়লাব প্রতিশ্রুতি: নিজ এলাকাকে উন্নত রোল মডেল করার অঙ্গীকার

সামাজিক মাধ্যম ও মাঠে সয়লাব প্রতিশ্রুতি: নিজ এলাকাকে উন্নত রোল মডেল করার অঙ্গীকার
📷 ছবি: সংগৃহীত
সামাজিক মাধ্যম ও মাঠে সয়লাব প্রতিশ্রুতি: নিজ এলাকাকে উন্নত রোল মডেল করার অঙ্গীকার

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার

আসন্ন স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বইছে আগাম ভোটের হাওয়া। ভোটের বাদ্য বাজতেই গ্রাম-মহল্লায় শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ, উঠান বৈঠক আর পরিচিতি সভার হিড়িক। ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা নিজেদের একেকজন খাঁটি 'জনদরদী' ও সমাজসেবক হিসেবে উপস্থাপন করতে এখন দারুণ ব্যস্ত সময় পার করছেন। দিন-রাত এক করে ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে উগরে দিচ্ছেন জমিয়ে রাখা দরদ। প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে নিজস্ব এলাকাকে প্রচ্যোর উন্নয়নশীল দেশে রুপান্তর করার অঙ্গীকার করছে। তাছাড়া ফেসবুক সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারনায় সয়লাব হয়ে গেছে।
তবে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু প্রার্থীদের এই অতি-ব্যস্ততা নয়, বরং ভোটের মাঠে রাতারাতি 'জনদরদী' হয়ে ওঠার মেকি প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিন ধরে যেসব গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট, কালভার্ট কিংবা ড্রেনেজ সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই হঠাৎ সেগুলোর সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। কোনো সরকারি বরাদ্দ বা প্রশাসনিক উদ্যোগে নয়; সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীরা নিজ নিজ অর্থায়নে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালাচ্ছেন এসব আপাত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। স্থানীয় সচেতন মহল একে জনসেবার চেয়েও 'ভোটের রাজনীতি' এবং ভোটারদের আবেগ ব্যবহার করে 'জনআস্থা অর্জনের কৌশল' হিসেবেই দেখছেন।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর ধরে গ্রামগুলোর মূল কাঁচা রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অযোগ্য পড়ে ছিল। ভাঙা কালভার্ট, মশার উপদ্রব কিংবা সুয়্যারেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে ইতিপূর্বে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারে বারবার ধর্না দিয়েও কোনো সমাধান মেলেনি। অথচ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই প্রার্থীদের দীর্ঘদিনের সেই উদাসীনতা উবে গেছে। নিজেদের জনদরদী প্রমাণ করতে প্রার্থীরা এখন মহা ব্যস্ত।
ভোটের হাওয়া লাগতেই কোথাও প্রার্থীর নিজস্ব টাকায় ভাঙা রাস্তায় মাটি বা ইট ফেলা হচ্ছে, কোথাও নিজ খরচে মেরামত করা হচ্ছে কালভার্ট, আবার কোথাও পথচারীদের সহানুভূতি কুড়াতে রাতের অন্ধকারে বসানো হচ্ছে বৈদ্যুতিক বাতি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের ‘উন্নয়নবান্ধব’ নেতা হিসেবে জাহির করতেই প্রার্থীরা এই কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। বিগত দিনগুলোতে এলাকার মানুষের সংকটাপন্ন মুহূর্তে পাশে না থাকলেও, ঠিক নির্বাচনের প্রাক্কালে পকেটের টাকা ঢেলে তারা ভোটারদের সহানুভূতি কিনতে চাইছেন।
অনেক ভোটার সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে, আজ ভোটের হাওয়া লাগতেই সেগুলো কয়েকদিনে অলৌকিকভাবে সমাধান হয়ে যাচ্ছে! প্রার্থীরা এখন জনদরদী সাজতে মহা ব্যস্ত, কিন্তু এগুলো কোনো প্রকৃত জনসেবা নয়—এগুলো স্পষ্টত ভোটের বাণিজ্য।"
স্থানীয় অভিজ্ঞ মহলের মতে, নির্বাচনের মুখে ব্যক্তিগত টাকায় করা এসব সাময়িক কাজ এলাকার দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। ভোট পার হয়ে গেলে বিজয়ী বা পরাজিত যা-ই হোক না কেন, প্রার্থীরা দ্রুতই আবার আগের রূপে ফিরে যান—এমন অভিজ্ঞতা এলাকাবাসীর কাছে নতুন নয়।
তাই এবার দোহার-নবাবগঞ্জের সাধারণ ভোটাররা কেবল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের দেখানো এই 'ব্যস্ত জনদরদ' কিংবা হঠাৎ শুরু হওয়া উন্নয়ন দেখে প্রলোভনে পা দিতে নারাজ। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীর অতীত রেকর্ড, সততা ও যোগ্যতার বিচার করেই তারা তাদের অমূল্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।