সারাদেশ

ডেঙ্গু: মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, অবহেলার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ

ডেঙ্গু: মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, অবহেলার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ
📷 ছবি: সংগৃহীত
ডেঙ্গু: মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, অবহেলার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ

মোহাম্মদ উল্যা
বিশেষ প্রতিনিধি
কোম্পনীগঞ্জ,নোয়াখালী।

ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি জ্বর নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমবর্ধমান এক ভয়াবহ সংকেত। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। কোথাও শয্যার সংকট, কোথাও চিকিৎসাসেবায় দীর্ঘ অপেক্ষা; আবার অনেকে হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রশ্ন হলো—ডেঙ্গু কি শুধু এডিস মশার কারণে ছড়ায়, নাকি আমাদের অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতাও এর বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে?

বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, পুরোনো টায়ারসহ সামান্য পানিও এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই ‘প্রতি ৩ দিনে ১ দিন;জমা পানি ফেলে দিন’—এই অভ্যাসটি পরিবার থেকে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। শুধু প্রচার নয়, নিয়মিত তদারকি ও বাস্তবায়ন জরুরি।

বিশেষ করে এসি ও ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি, ছাদ ও ড্রেনের পানি, নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত এবং বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র নিয়মিত পরীক্ষা করে পরিষ্কার করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন পুরো বাড়ি ও আশপাশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো উচিত।

কিন্তু শুধু জনগণকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সরকারি পরিচ্ছন্নতা অভিযান দুর্বল হলে, ড্রেন-নালা-খাল ময়লায় ভরে থাকলে এবং মশক নিধন কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি যেন—‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। উদ্বোধন হয়, প্রচার হয়; কিন্তু নিয়মিত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা থাকে না। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মশক নিধন কর্মসূচি হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, নিয়মিত ও এলাকাভিত্তিক। কোথায় এডিসের প্রজনন বেশি হচ্ছে, কোথায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে—তথ্য বিশ্লেষণ করে সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু দৃশ্যমান স্থানে ওষুধ ছিটিয়ে ছবি তোলা নয়; মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।

একই সঙ্গে ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও প্রস্তুত রাখতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তরল ব্যবস্থাপনা, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় অযথা আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা।

জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি ভাব বা র‍্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ না খাওয়াই নিরাপদ; জ্বর নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা উচিত।

এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলাতেও কামড়ায়। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি, রিপেলেন্ট, শরীর ঢাকা পোশাক এবং অন্যান্য নিরাপদ প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

তবে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, এডিসের প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ব্যবস্থা থাকতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজের পরিমাণ ও ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কোথায় কতবার অভিযান হয়েছে, কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস হয়েছে এবং রোগীর প্রবণতা কী—এসব বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু কয়েক মাসের অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ। জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর তৎপর হওয়ার চেয়ে প্রকোপ বাড়ার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। একটি প্রাণহানি ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া সাফল্য নয়; প্রাণহানি ঠেকাতে আগেই ব্যবস্থা নেওয়াই প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্য।

এখন সময় দায় চাপানোর নয়—দায়িত্ব নেওয়ার।
সময় কাগুজে কর্মসূচির নয়—দৃশ্যমান বাস্তবায়নের।
সময় শুধু মশা মারার নয়—মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার।
আর সময় শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকারও নয়—প্রতিটি নাগরিকের নিজের ঘর, নিজের আঙিনা ও নিজের এলাকা পরিষ্কার রাখার।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যর্থতার মূল্য শুধু অর্থ নয়—একটি জীবনও হতে পারে। তাই আজই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহিতা। নইলে আজকের অবহেলা আগামী দিনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।