কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি
দুইজনের মৃত্যু, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাড়ছে রোগীর চাপ;পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতায় জোর
মোহাম্মদ উল্যা
বিশেষ প্রতিনিধি:
কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গু সন্দেহে এবং নিশ্চিত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ বেড়েছে। এ পর্যন্ত উপজেলায় ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। শয্যা ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতার কারণে জটিল বা গুরুতর অবস্থার কিছু রোগীকে নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালসহ উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করা হচ্ছে।
তবে ডেঙ্গু আক্রান্তদের সবাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। অনেক রোগী স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার কিছু রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিজ বাড়িতেও চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। ফলে উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ডেঙ্গুর বিস্তার থেকে বাদ যাচ্ছেন না বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয় চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও প্যাথলজিস্টসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টানা বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশেষ করে বাজার, বাসাবাড়ির আশপাশ, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ বা মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অন্তত সপ্তাহে দুই দিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হলে এডিস মশার প্রজননস্থল অনেকটাই কমানো সম্ভব।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও মাংসপেশিতে ব্যথা, বমি বা বমি ভাব দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা শ্বাসকষ্টের মতো সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের কথা জানানো হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসব কার্যক্রমকে আরও ব্যাপক ও নিয়মিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং প্রয়োজনীয় মশকনিধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।
কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে;এমন আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতিকে মহামারি হিসেবে উল্লেখ করার আগে সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন প্রয়োজন হলেও এখনই সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে প্রশাসন;সব পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগই ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কোম্পানীগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি
📷 ছবি: সংগৃহীত