অস্তিত্ব মোবারকগঞ্জ সুগার মিল: উৎপাদন ঘাটতি ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জে থামছে না লোকসানের চাকা
ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থকরী ফসল আখ এবং একমাত্র ভারী শিল্প মোবারকসংকটেগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড (মৌচিক) আজ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অর্ধশতাব্দীর পুরনো জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি, আখের তীব্র কাঁচামাল সংকট এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারমূল্যের অসমতার কারণে কারখানাটি ক্রমশ অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সম্প্রতি বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে আবারও প্রায় ৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সমসাময়িক প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
আশঙ্কাজনকভাবে আখ চাষ ও কাঁচামাল হ্রাস:
কারখানা এলাকার চাষিরা আখ চাষে উৎসাহ হারাচ্ছেন। আখ একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসল (১২–১৪ মাস সময় লাগে)। চাষিদের বকেয়া পাওনা আংশিক পরিশোধ এবং সার-বীজের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেকে সবজি, ভুট্টা ও ধান চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। ফলে মিলটি তার প্রয়োজনীয় মোট ক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ আখও মাড়াইয়ের জন্য পাচ্ছে না।
অনভিপ্রেত উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্য:
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (BSFIC) তথ্যানুযায়ী, সরকারি মিলগুলোতে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় প্রায় ২৬০ টাকা বা তারও বেশি। অথচ বাজারে সরকারি ও বেসরকারি চিনি বিক্রি করতে হয় ১১০ থেকে ১২৫ টাকা দরে। প্রতি কেজিতে বিপুল পরিমাণ এই লোকসান কারখানার আয়ের ভিত্তিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
পুরনো প্রযুক্তি ও চিনি আহরণের নিম্ন হার:
বিশ্বজুড়ে আধুনিক কারখানায় আখ থেকে চিনি আহরণের গড় হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ হলেও মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫.৫ থেকে ৬ শতাংশে। কারখানার যন্ত্রপাতি ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরনো হওয়ায় মাড়াই মৌসুমের মাঝপথেই বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, যার ফলে মাড়াই বন্ধ হয়ে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
ব্যাংক ঋণের সুদের বোঝা ও জমানো চিনি:
উৎপাদিত চিনি বাজারজাতকরণে গতিহীনতার কারণে গুদামে পড়ে থাকে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত চিনি। একদিকে মূলধন আটকে থাকা, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে কারখানার আর্থিক অবস্থা ক্রমশ ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাব্য উপায় ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চিনি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত পণ্যের ব্যবহার: কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মতো ডিস্টিলারি ইউনিট, জৈব সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বায়োগ্যাস প্রকল্প চালু করা।
বিএমআরই (BMRE) ও আধুনিকায়ন: পুরনো যন্ত্রপাতি দ্রুত আধুনিকায়ন করে চিনি আহরণের হার বাড়ানো।
চাষিদের প্রণোদনা প্রদান: আখ চাষিদের সঠিক সময়ে সার, উন্নত জাতের বীজ এবং আখের বকেয়া মূল্য দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা।
উপসংহার
মোবারকগঞ্জ সুগার মিল কেবল একটি কারখানা নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার চাষি ও শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখনই সরকারি উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা না হলে এই অঞ্চলে শিল্প খাতের এ শেষ ভরসাস্থলটিও অচিরে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখাতে পারে।
কোটি কোটি টাকার লোকসানে চলছে ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ সুগার মিল
এই ভিডিওটিতে ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ সুগার মিলের বর্তমান যান্ত্রিক সংকট, লোকসানের কারণ এবং স্থানীয় আখচাষি ও শ্রমিকদের সরেজমিন চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
অস্তিত্ব মোবারকগঞ্জ সুগার মিল: উৎপাদন ঘাটতি ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জে থামছে না লোকসানের চাকা
📷 ছবি: সংগৃহীত