সুসময়ে 'সুবিধাভোগী'দের জয়জয়কার, আড়ালে দুঃসময়ের ত্যাগীরা: রাজনীতি কি তবে দালালদেরই
ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সময় বদলায়, ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়, কিন্তু এক শ্রেণীর মানুষের ভাগ্য থেকে যায় অপরিবর্তিত। তারা সুযোগসন্ধানী, রাজনৈতিক পরিভাষায় যাদের 'সুবিধাভোগী' বা 'দালাল' বলে আখ্যা দেওয়া হয়। হামলা, মামলা, কিংবা জেল-জুলুমের দিনগুলোতে যাদের দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি, ক্ষমতার বাতাস বদলাতেই তারা এখন রাজপথ ও মঞ্চের প্রথম সারিতে। পক্ষান্তরে, এক দশক ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েসুসময়ে দল আঁকড়ে রাখা ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা আজ পড়ে আছেন নেপথ্যে।
এক দশক ধরে মাঠপর্যায়ের প্রত্যক্ষ করা এই বাস্তবতা আজ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম চিত্র হয়ে উঠেছে।
দুঃসময়ের রক্ত-ঘাম, সুসময়ে শূন্য হাত
২০১৪ সাল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পার করেছে তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও সংকটময় অধ্যায়। ওই সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, মশাল মিছিল, কিংবা অবরোধের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নেতা-কর্মীদের পার করতে হয়েছে চরম অনিশ্চয়তার দিন।
তৃণমূলের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কালীগঞ্জের মতো আঞ্চলিক রাজনীতিতে যেখানে বিএনপি 'ফিরোজ-হামিদ' গ্রুপ বা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত ছিল, সেখানে রাজপথে গোটি কয়েকজন পরিচিত মুখ ছাড়া কাউকে দেখা যেত না। দিনের পর দিন ঘরছাড়া হওয়া, ফেরারি জীবনযাপন এবং কারাগারে রাত কাটানো ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী, আজ ক্ষমতার সুবাতাসে তারা দৃশ্যপট থেকে উধাও।
অথবা, তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে পেছনের সারিতে। আর ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর যাদের আবির্ভাব ঘটেছে মঞ্চের আলো ঝলমলে প্রথম সারিতে, তৎকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করার কোনো ছবি, ভিডিও বা ন্যূনতম কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। মামলা-হামলার দাগ তো দূরের কথা, দুঃসময়ে তাদের উপস্থিতিই ছিল শূন্য।
খোলস বদলের রাজনীতি: জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগ
রাজনীতির এই 'আপডেট ভার্সন' বা খোলস বদলের খেলা কেবল বিএনপির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতেও পটপরিবর্তনের পর নতুন কিছু মুখের পদচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যারা অতীতে কোনো ত্যাগ স্বীকার না করেও এখন দলটির নীতি-নির্ধারণী জায়গায় জায়গা করে নিচ্ছেন। সুযোগ এলে তারা যে আবার দ্রুত খোলস পালটে ফেলবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
ঠিক একই চিত্র দেখা গিয়েছিল ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঠিক পূর্ব মুহূর্তেও। আওয়ামী শাসনামলে অনেক পোড় খাওয়া ও ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাই নিজস্ব বলয়ের দুর্নীতি ও দালালদের তোপের মুখে পড়ে বিরোধী দলের মতো নিপীড়িত জীবন যাপন করেছেন। আর ফায়দা লুটেছে সুবিধাবাদী শ্রেণী। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে সেই একই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখন নিজেদের রূপ বদলে বিএনপির রাজনীতিতে ভিড়ে গিয়ে নতুন করে 'মধু' পানে ব্যস্ত।
তৃণমূলের ক্ষোভ ও রাজনীতির মূল ধারায় ফেরার তাগিদ
দল যখন সংকটে থাকে, তখন দল রক্ষা করে রাজপথের সাধারণ ও তৃণমূল কর্মীরা। কিন্তু দল যখন সুসময়ের মুখ দেখে, তখন নীতি ও আদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে লবিং, দালালি আর সুযোগসন্ধানী রাজনীতি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কোনো কর্মী দলের দুঃসময়ে জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলবে।
যদি জাতীয়তাবাদী দল বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মূল ধারার ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চায়, তবে এখনই সময় শিকড়ে ফিরে যাওয়ার:
তৃণমূলের মূল্যায়ন: ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যারা হামলা, মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে দলীয় মূলধারায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বসন্তের কোকিলদের ছাঁটাই: সুসময়ে হঠাৎ আবির্ভূত 'হেভিওয়েট' সুবিধাবাদীদের মঞ্চের সামনের সারি থেকে হটিয়ে ত্যাগীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে হবে।
তৃণমূলকে নেতৃত্বের আসনে আনা: তৃণমূলের পরীক্ষিত নেতাদের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে রাজনীতির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসে।
দিন যায়, দিন আসে। ক্ষমতার মসনদ বদলায়, কিন্তু ত্যাগীদের বঞ্চিত করে দালালদের জয়জয়কার চলতে থাকলে রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলবে। এখন সময় এসেছে হাইব্রিড ও সুবিধাভোগীদের রাজনৈতিকভাবে বর্জন করে দুঃসময়ের কাণ্ডারিদের হাতেই দলের লাগাম তুলে দেওয়ার।
সুসময়ে 'সুবিধাভোগী'দের জয়জয়কার, আড়ালে দুঃসময়ের ত্যাগীরা: রাজনীতি কি তবে দালালদেরই
📷 ছবি: সংগৃহীত