তপ্ত উনুন ও থালা-বাসনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে তাবাসসুম এর শৈশব
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে কাটানোর কথা, যে বয়সে রঙিন স্বপ্নে ভরে ওঠার কথা একটি শিশুর পৃথিবী, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ১১ বছরের তাবাসসুম। যে হাতে থাকার কথা পাঠ্যবই আর পেন্সিল, সেই ছোট্ট হাতে এখন শোভা পায় হোটেলের থালা-বাসন। শ্রেণিকক্ষের পাঠ আর সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দময় সময়ের বদলে তার দিন কাটছে বাবার হোটেলে তাঁকে সাহায্য করে।
তবে তাবাসসুমের স্বপ্নটা আর দশটি শিশুর মতোই সুন্দর। সে বড়ো হয়ে শিক্ষক হতে চায়। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষার্থীদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিল সে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অনটন তার সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভাবের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে পড়াশোনা, থমকে গেছে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথচলা।
তাবাসসুমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা করার অদম্য ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার বদলে তাকে এখন বাবার হোটেলে কাজে সহযোগিতা করতে হচ্ছে।
ঢাকার দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের জামালচর গ্রামের তাবাসসুমের বাবা আছগর। দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড়ো মেয়ে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কোন রকমে লেখাপড়া এখনো চালিয়ে নিচ্ছেন। তিনি জানান, ছোট মেয়েকে এলাকার একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দু মেয়ের বিদ্যালয়ের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গত দুই মাস ধরে তাবাসসুমের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ রেখেছেন। এর ওপর হোটেলের ব্যাবসাও তেমন ভালো চলছে না।
আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য।
একজন বাবার কাছে সন্তানের ভবিষ্যতের চেয়ে বড়ো কিছু নেই। মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সংকট যেন সেই পথ আটকে দিয়েছে। অন্যদিকে, যে বয়সে তাবাসসুমের বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সে বয়সেই তাকে পরিবারের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
দারিদ্র্যের এই বাস্তবতায় তাবাসসুমের শৈশব যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে হোটেলের ব্যস্ততার ভিড়ে। অথচ তার চোখে এখনো বেঁচে আছে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই যেন তাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সে একদিন পড়াশোনায় ফিরতে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।
তাবাসসুমের গল্প শুধু একটি পরিবারের আর্থিক সংকটের চিত্র নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে অর্থের অভাবে একটি শিশুর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যায়। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সে কেন তাকে পরিবারের অভাবের বোঝা বহন করতে হবে। এ প্রশ্ন আমাদের সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়।
শিক্ষা প্রতিটি শিশুর অধিকার। আর্থিক সংকট যেন কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ। তাবাসসুমের মতো শিশুরা যেন আবার বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে, হাতে তুলে নিতে পারে বই-খাতা—সেই সুযোগ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
হোটেলের থালা হাতে কাজ করতে থাকা তাবাসসুমের ছোট্ট মুখটির দিকে তাকালে তাই মনে জাগে একটাই প্রত্যাশা। একদিন এই হাতেই হয়ত আবার শোভা পাবে বই-খাতা। দারিদ্র্যের বাধা পেরিয়ে সে ফিরে যাবে বিদ্যালয়ে, আর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে নতুন করে এগিয়ে যাবে।
তাবাসসুমের স্বপ্ন পূরণ হোক। শুধু তার নিজের জন্য নয়, এমন সব শিশুর জন্যও, যাদের মেধা ও সম্ভাবনা কেবল অভাবের কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।