বড় ভাই আজিজল হক, তাহলে মজিবরই ‘আজিজল’ কীভাবে?
১৯৪৮ সালের দলিল, জন্মসন ও খতিয়ান নিয়ে প্রশ্ন—সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে নতুন বিতর্ক
আব্দুর রাজ্জাক সরকার, স্টাফ রিপোর্টার,
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের দক্ষিণ খোলাবাড়ীতে জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে দায়ের করা সিআর মামলা নং-১৬২৩/২০২৫-এর তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মোঃ মজিবর রহমান সরকার ও ‘আজিজল হক’ একই ব্যক্তি—সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে মামলার নথিতে থাকা পারিবারিক পরিচয়, জন্মসন, পুরোনো দলিল ও ভূমি রেকর্ডের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মজিবর রহমানের বড় ভাই যদি আজিজল হক হয়ে থাকেন, তাহলে মজিবর রহমান কীভাবে সেই আজিজল হকের পরিচয়ে ১৯৪৮ সালের জমির দলিলের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
জন্মসনের হিসাবেই বড় প্রশ্ন:
মামলার নথিতে থাকা অভিযোগ অনুযায়ী, আজিজল হক ছিলেন মজিবর রহমানের বড় ভাই এবং তিনি ১৯৫৫ সালে নাবালক অবস্থায় মারা যান। অথচ সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে আজিজুল ওরফে মজিবর প্রকৃত জন্মসাল ১৯৪২ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নথির অন্য অংশে বড় ভাই আজিজার রহমানের জন্মসাল ১৯৪৪ উল্লেখ রয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে গুরুতর অসঙ্গতি।
যিনি বড় ভাই, তার জন্ম ১৯৪৪ এবং যিনি ছোট ভাই, তার জন্ম ১৯৪২—এটি কীভাবে সম্ভব?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মজিবর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯৫১ উল্লেখ থাকার কথাও মামলার নথিতে এসেছে। ফলে একই ব্যক্তিকে ঘিরে ১৯৪২, ও ১৯৫১—দুই ধরনের জন্মসনের তথ্য সামনে আসায় তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নথি যাচাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৪৮ সালের দলিলে আসলে কে?
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৯ মার্চ ১৯৪৮ সালের ৪০১৭ নম্বর হেবাবিল এওয়াজ দলিলে ‘মোঃ আজিজল হক সরকার’ নামে একজনকে জমির গ্রহীতা করা হয়।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই ব্যক্তি ছিলেন মজিবর রহমানের বড় ভাই আজিজল হক। কিন্তু পরবর্তীতে মজিবর রহমান নিজের নামের সঙ্গে আজিজল হকের নাম যুক্ত করে ‘আজিজল হক ওরফে মজিবর রহমান’ পরিচয়ে বিভিন্ন নথিতে সম্পত্তির দাবি করেছেন।
তবে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আজিজল’ ছিল মজিবর রহমানের ডাকনাম এবং ১৯৪৮ সালের দলিলে নাবালক থাকার কারণে তার পূর্ণ নামের পরিবর্তে শুধু ‘আজিজল’ নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়েই এখন মূল প্রশ্ন।
২০১৩ সালের খতিয়ানেও ‘মজিবর রহমান’
অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খতিয়ান নং-১১০৪, তারিখ ১ নভেম্বর ২০১৩-এর সেটেলমেন্ট রেকর্ডেও ‘মোঃ মজিবর রহমান’ নাম পাওয়া যায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি ১৯৪৮ সালের দলিলের ‘আজিজল হক’ এবং বর্তমান মজিবর রহমান একই ব্যক্তি হন, তাহলে তার পরিচয়ের ধারাবাহিকতা কোন কোন সরকারি নথিতে রয়েছে?
আর যদি তারা পৃথক ব্যক্তি হন, তাহলে পরবর্তী সময়ে কীভাবে ‘আজিজল হক ওরফে মজিবর রহমান’ পরিচয় তৈরি হলো?
২০১৫ সালের বণ্টননামা নিয়েও প্রশ্ন:
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালের ১৮৬৮ নম্বর বণ্টননামা দলিলের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ‘মোঃ আজিজল হক ওরফে মজিবর রহমান’ পরিচয় পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগকারী পক্ষের প্রশ্ন, ২০১৫ সালের একটি দলিলে কোনো নামের সঙ্গে ‘ওরফে’ যুক্ত থাকাই কি ১৯৪৮ সালের দলিলের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট?
তাদের দাবি, এ ক্ষেত্রে ১৯৪৮ সালের মূল দলিল, উত্তরাধিকার নথি, জন্মসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড, ভোটার তালিকা, এনআইডির ইতিহাস, আজিজল হকের মৃত্যু সংক্রান্ত নথি এবং পরবর্তী ভূমি রেকর্ডের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
১৯৯০ সালের বাটোয়ারা মামলাও গুরুত্বপূর্ণ:
মামলার নথিতে ১৯৯০ সালের ০৫/৯০ নম্বর বাটোয়ারা মামলার উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই মামলায় মজিবর রহমানকে বিবাদী করা হলেও ১৯৪৮ সালের দলিলের ‘আজিজল হক’ এবং মজিবর রহমান একই ব্যক্তি কি না—এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে ওই বাটোয়ারা মামলা ও পরবর্তী ২০১৫ সালের বণ্টননামাকে মজিবর রহমান ওরফে আজিজলের পরিচয়ের ধারাবাহিকতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফলে দুই পক্ষের নথি-ব্যাখ্যার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন:
তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ জিয়ারুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে মত দিয়েছেন, মামলায় মজিবর রহমান সরকার ওরফে আজিজলের বিরুদ্ধে আনা ভূমি অপরাধ ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হয়নি।
কিন্তু অভিযোগকারী পক্ষের প্রশ্ন—যে পরিচয়-বিরোধকে কেন্দ্র করেই পুরো মামলা, সেই পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সব প্রাথমিক সরকারি নথি কি সমানভাবে যাচাই করা হয়েছে?
বিশেষ করে—
১৯৪৮ সালের মূল হেবাবিল এওয়াজ দলিল;
আজিজল হক ও মজিবর রহমানের পারিবারিক সম্পর্ক;
বড় ভাই আজিজার রহমানের জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য;
মজিবর রহমানের জন্মসনের সরকারি উৎস;
১৯৫১ সালের এনআইডি তথ্য;
২০১৩ সালের খতিয়ান;
১৯৯০ সালের বাটোয়ারা মামলা;
২০১৫ সালের বণ্টননামা—
এসব নথির মধ্যে ধারাবাহিকতা যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তদন্ত কর্মকর্তার আচরণ নিয়েও অভিযোগ:
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়ারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে, অভিযোগকারী পক্ষের দাবি অনুযায়ী তিনি সাংবাদিককে ‘চিটার’ বলে সম্বোধন করেন এবং ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে একজন তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ কোনো তদন্তের বিষয়ে সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তার উত্তর দেওয়া অথবা নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়াই প্রত্যাশিত; ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হুমকির অভিযোগ উঠলে সেটিও পৃথকভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে।
‘কেন মজিবরকে আজিজল হিসেবে দেখানো হলো?’—জনমনে প্রশ্ন
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে মজিবর রহমানকে আজিজল হক হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এমন কিছু তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে অন্যান্য নথির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের প্রশ্ন—কোন প্রাথমিক ও নির্ভরযোগ্য সরকারি নথির ভিত্তিতে মজিবর রহমান ও আজিজল হককে একই ব্যক্তি হিসেবে নিশ্চিত করা হলো?
এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে যদি মজিবর রহমানের প্রকৃত জন্মসাল ১৯৪২ বলা হয়, তাহলে একই নথিতে তার বড় ভাই আজিজার রহমানের জন্মসাল ১৯৪৪ কীভাবে আসে—এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি:
অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে জেলা পুলিশের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পুনঃতদন্তের দাবি:
এ অবস্থায় অভিযোগকারীর পক্ষ সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়ন বা নিরপেক্ষভাবে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, ১৯৪৮ সালের মূল দলিল থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের খতিয়ান, ২০১৫ সালের বণ্টননামা এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি রেকর্ড পাশাপাশি রেখে পরিচয় ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করা হোক।
কারণ, এই বিরোধের মূলে শুধু জমির মালিকানা নয়—একই ব্যক্তি নাকি দুই ব্যক্তি, ‘আজিজল হক’ নাকি ‘মজিবর রহমান’—এই পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথিতে থাকা এই জন্মসন, পারিবারিক পরিচয় ও দলিলের অসঙ্গতিগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করেন
বড় ভাই আজিজল হক, তাহলে মজিবরই ‘আজিজল’ কীভাবে? ১৯৪৮ সালের দলিল, জন্মসন ও খতিয়ান নিয়ে প্রশ্ন—সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে নতুন বিতর্ক
📷 ছবি: সংগৃহীত